Sunday, February 15, 2009

ক্রমান্বয়ে ধ্বসে পড়া একটি পটভূমিতে যে অসাধারন শালিকটি বেঁচে ছিল , তার দুটি ডানা ঢেকে রেখেছিল হারিয়ে যাওয়া একটি পা এর ক্ষত কে

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৪:০৯



সৃষ্টির অব্যক্ততার মাঝেই যেন চরম মুখরতা প্রকাশ পায় ।
হয়ত এটা কোনদিনও লেখা হয়ে উঠতনা , যদিনা কাউকে কথা দিতে হত সেদিন ।

রাত্রীবেলায় হয়ত অনেকেই তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকে অনেক অবাক হবার চাওয়া নিয়ে , কিন্তু হয়ত পাওয়াটা পূর্ণতা পায়না , আবার শীতল বাতাসের ছোঁয়ায় কেউ হেঁটে যায় হাইওয়ে এর পাশের এক প্রান্ত ধরে ।

নাহ সাহিত্যিকতার খোলসে বন্দী হয়ে থাকার স্বভাব নেই বলেই অনেক বাজে কিছু লেখা বেরিয়ে আসে কি-বোর্ড দিয়ে ।
ঢাকার বাইরেই থাকতে চাই নিজস্ব কিছু পছন্দের কারনে । আর সেখানে থাকতে পারাটাই হয়ত জীবনে কিছু ভিন্নতর স্বাদ এনে দিয়েছে দু-হাত ভরে ।

যেখানে থাকি সেখানে অন্ততঃ প্রাকৃতিক এবং মানবিক বিশুদ্ধতার সংস্পর্শে খাঁটি কিছু সময় কেটে যায় । বাসার বাইরের গুটিকয়েক মানুষের সাথে কথা হয় , এবং বাস্তবিক অর্থেই তারা অত্যন্ত সরল ।
দিনের বেলায় ভোরের পরের অংশটুকু চায়ের দোকানের তিন ভাই আর দু'জন পিচ্চির সাথে কথা বলেই কিছু সময় পেড়িয়ে যায় । এরপর বাসায় এসে ঘুম । আর রাত্রে যখন জেগে থাকা হয় তখন মাঝের আর শেষ প্রহরের সময়টা আমাকে টেনে নিয়ে যায় ঘরের বাইরে । সে এক অদ্ভুত মাদকতা ।

কাছে পিঠেই দুটো চায়ের দোকান সারাদিনরাত খোলা থাকায় আমার মত খোর (!) দের জন্যে তা পুরোটাই অতীব আনন্দদায়ক । বিশেষ করে রাত দুটোর পরে ।
দু'কাপ চা ধোঁয়া উঠিয়ে তাল মিলিয়ে চলে সিগারেটের পাশাপাশি , আর আমি এলাকার গার্ডের চেয়ে থাকা দেখি রঙ্গীন টেলিভিশনের পর্দার দিকে । তারা গল্প করে ফাঁকে ফাঁকে , কিন্তু আমাকে ঘাঁটায় না ।
আলাদা একটা সম্ভ্রম মেশানো আচরণ তাদের কাছ থেকে হয়ত বিনা কারনেই পাওয়া হয় ।
চুপচাপ এরপর বেরিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে আসি ।
উত্তরবঙ্গের মূল হাইওয়ে সেটা এবং বেশ প্রশস্ত । হঠাৎ একটু শহুরে ধাঁচ শুরু না হতেই আবার গ্রাম্য এলাকা দুপাশ ঘিরে , রাতে যা আমার চোখে অসাধারণ ।

কিলোখানেক এগিয়ে যাই , যেখানে শহুরে ভাবটা শেষ হয়ে গ্রাম্যভূবনের শুরু সেখানে একটা যায়গা আছে যেখানে বসা যায় । বাঁশের তৈরী একটা টং এর মত । রাস্তার কাছে পিঠে আর একপাশে দেখা যায় বিশাল ক্ষেত । যদি গ্রামের দিকে সরুপথ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া হয় তখন একটা যায়গা পাওয়া যায় ছোট বাঁধের মত একটা যায়গা । রাস্তার দু'পাশের গাছ গুলো শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে আর কালজিরার ধানের ক্ষেতের পাশে বসে হাল্কা সৌরভ নেয়া যায় প্রাণভরে । তখনও সঙ্গী থাকে সিগারেট ।
মাতালপ্রায় অবস্থা হয় ।
চিন্তার বাঁধনগুলো ঢিলে হয়ে প্রকৃতির মাঝেই হারিয়ে যায় দুর্দান্ত মাদকতায় ।
আকাশে থাকে হয় চাঁদ নয় তারা , বিশুদ্ধ বাতাসে আকাশের দৃশ্যাবলীও বিশুদ্ধতা লাভ করে ।

বিশাল চারপেয়ে ইলেক্ট্রিসিটির থামের উদ্ধত দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেও যখন সবুজের ভীড় থাকে রাত্রে রঙ বোঝা না গেলেও কিরকম হতে পারে তা সহজেই অনুমেয় । আর এখন তো কুয়াশা , বলাই বাহূল্য কি অবস্থা ।



এভাবে ধীরে ধীরে ভোর হয় । বাইরে থাকিনা কিছুক্ষণ কিন্তু বিরতি শেষে আবার বাহিরে যাই ভোরের আজানের আগেই ।
তখন আর একরূপ ।
ভাপাওয়ালা তার চুলোয় জ্বাল দেয় আর চা এর আর এক দোকান প্রস্তুত হতে থাকে দিনের সরবরাহ তৈরীর জন্যে ।
একটু হাঁটি আর মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে গল্প জুড়ে দেই ।

ধীরে যখন ভোরের আলো উঁকি দেয়া শুরু করে , তখন অদ্ভুত এক স্বর্গীয় পরিবেশের মত অবস্থা হয় যা একমাত্র দেখলেই বোঝা সম্ভব ।
শ'খানেকের বেশি শালিকের জোড়া রাস্তায় নেমে আসে , হয়তবা রাস্তায় কেউ কিছু ছড়িয়েও রাখেনা কিন্তু আসে পাশের গাছ বেশি বলে এসময় সেসব জড়ো হয় সেখানে ।
রাস্তায় লম্বা তারের দিকে এক ভাবে তাকালে দেখা যায় ছয়টা মোবাইলের টাওয়ার এর অগ্রভাগ আর পাখিগুলো উড়ছে কিচিরমিচির করে ।
সড়ক ও জনপদ নামক সরকারী প্রতিষ্ঠানের বিশাল এলাকা এদের অভয়ারন্য আর তাই এতগুলো পাখিকে একসাথে দেখা যায় ।

অনেকের মত আমিও জোড়া শালিকের কথাই ভাবি । কোথাও কিছু হলেও গুনে দেখি জোড়া আছে কিনা ।
কিন্তু অদ্ভুত একটা শালিক আছে যা শুধু চায়ের দোকানের কাছাকাছি কোথাও থাকে । কোন এক কারণে একটা পা গোড়ার একটু পর থেকেই নেই ।
একপা দিয়ে যে কিভাবে ভারসাম্য রাখে তা আসলেও অবাক করে ।
কিন্তু তার লাফিয়ে চলাটা অন্যরকম সাবলীল । পাখা ঝাপ্টিয়ে যেভাবে দুটো পা সমান্তরাল হয় সেভাবে মাটিতে বসে খাবার যোগায় ঠোঁটে । প্রথমে ভেবেছিলাম হয়ত একবারই দেখব । কিন্তু পরপর বেশক'দিন দেখেছিলাম ।

এখন আমি সে এলাকা থেকে বেশ দূরে কিন্তু আবার ফিরে যাব বলেই মন ভাল হয়ে উঠছে ।

আবার দেখব সেই চায়ের দোকানদার এর প্রিয়মুখ , যে যাওয়া মাত্র চা এগিয়ে দেবে । আর মাঝে মাঝে শোনাবে , " মামা আমি কিন্তু এরপর আর সেই কাজ করিনি ।"
আমার কথায় কেউ গাঁজা ছেড়ে দিয়েছে তাও প্রায় মাসখানেক আগে এরকম একমাত্র মানুষ সে ।
মজার কিছু হয়ত শোনা যাবে , সন্ধ্যায় সেখানে হয়ত খাসীর টিকিয়া আর ডালপুরী নাহলে চিংড়ীর চপ এবং মোগলাই খাওয়া হবে অনেক সস্তায় ।
আবার হয়ত একজন এসে প্ল্যান করে ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকা ভ্রমণের জন্যে পীড়াপীড়ি করবে আমার সাথে ।

দিনশেষে ব্যাস্ত আমিও থাকব নিজের কাজে । আবার সেই জোড়াছাড়া শালিকের মত আমিও একা একা এগিয়ে যাব নিজের মত করে ।
সবাইকে এভাবেই এগিয়ে যেতে হয় কারণ , আবার যে অন্য কোথাও উড়ে যেতেই হবে অজানা কোন কিছুর আশায় !!!